মদিনার ঐতিহাসিক স্থানগুলো
আসসালামু আলাইকুম আশাকরি সকলে মহান আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন। এর আগে একটি পোষ্টে আমি মক্কার দর্শনীয় কিছু স্থান নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আপনারা যদি সেটি না দেখে থাকেন তাহলে নিচের লিংকে গিয়ে পড়ে আসুন -
আজকের পোষ্টে আমরা মদিনার কিছু ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে জানব।
ঐতিহাসিক মসজিদ, ঐতিহাসিক পাহাড় এবং ঐতিহাসিক কবরগুলো সম্পর্কে আমরা আলোচনা করব। তো চলুন মূল পোষ্টে চলে যাওয়া যাক। আমি নিচে এক এক করে সব গুলো ঐতিহাসিক স্থান সাজিয়ে দিলাম -
ঐতিহাসিক মসজিদ
১/মসজিদে নববি-
মদিনায় পৌঁছে হুজুর (সা.) আল্লাহর নির্দেশে সর্বপ্রথম হজরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) বাড়ি সংলগ্ন একটি জমি ক্রয় করে সেখানে নিজ হাতে একটি মসজিদ তৈরি করেন, যা মসজিদে নববি নামে পরিচিত। হুজুর (সা.) বলেন, আমার এ মসজিদে নামাজ পড়া মসজিদে হারাম ছাড়া অন্যত্র হাজার নামাজ অপেক্ষা উত্তম। এবং তিনি যে তিন মসজিদকে ভিত্তি করে ভ্রমণ বৈধ বলেছেন, মসজিদে নববি তার মধ্যে একটি।
২/কিবলাতাঈন মসজিদ-
এ মসজিদে একই নামাজ দুই কিবলামুখী হয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে ওহি পাওয়ার পর নবী (সা.) ‘মসজিদ আল-আকসা’ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নামাজের মাঝখানে মক্কামুখী হয়ে পরবর্তী অংশ সম্পন্ন করেছিলেন। এ জন্য এ মসজিদের নামকরণ করা হয় কিবলাতাঈন (দুই কিবলা মসজিদ)। মসজিদের ভেতরে মূল পুরোনো মসজিদের অংশ অক্ষত রেখে চারদিকে দালান করে মসজিদ বর্ধিত করা হয়েছে।
৩/মসজিদে কুবা-
হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় আগমন করে প্রথম শহরের প্রবেশদ্বারে কুবা নামক স্থানে নামাজ পড়েন। পরে এখানে মসজিদ গড়ে ওঠে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ঘর থেকে অজু করে মসজিদে কুবায় গিয়ে নামাজ পড়লে একটি ওমরাহর সমান সওয়াব পাওয়া যায়।
*মসজিদে মিকাত
মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে মসজিদে নববী থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এ মসজিদটি অবস্থিত। মদিনাবাসীর মিকাত বলে এ মসজিদটি মসজিদে মিকাত নামে পরিচিত।
৪/মসজিদে জুমু’আ-
রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের সময় কুবার অদূরে রানুনা উপত্যকায় ১০০ জন সাহাবাকে নিয়ে মসজিদে জুমু’আর স্থানে প্রথম জুমু’আর সালাত আদায় করেন।
৫/মসজিদে গামামাহ-
এ মসজিদকে মোসাল্লাহও বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম ঈদের সালাত ও শেষ জীবনের ঈদের সালাতগুলো মসজিদে গামামাহয় আদায় করেন। এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়েছেন বলে একে মসজিদে গামামাহ বলা হয়। এটি মসজিদে নববীর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত।
৬/মসজিদে আবু বকর (রা.)-
এটি মসজিদে গামামাহর উত্তরে অবস্থিত। হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা থাকাকালে এ মসজিদে ঈদের সালাত পড়াতেন। তাই এটি মসজিদে আবু বকর (রা.) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
৭/মসজিদে দিরআ-
তৃতীয় হিজরিতে হুজুর (সা.) ৭০০ সাহাবা নিয়ে রওয়ানা করেন ওহুদের দিকে। পথিমধ্যে এক মসজিদে আসর, মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন এবং যুদ্ধের বর্ম পরিধান করেন। যার ফলে ওই মসজিদের নাম রাখা হয় মসজিদে দিরআ।
>> মসজিদে নববির দুই মাইল পশ্চিমে রয়েছে ঐতিহাসিক খন্দক প্রান্তর। যার পাশে অতি অল্প পরিসরে রয়েছে পাশাপাশি ছয়টি মসজিদ। মসজিদে ফাতহ, মসজিদে সালমান ফারসি, মসজিদে আবু বকর সিদ্দিক, মসজিদে ওমর, মসজিদে আলী ও মসজিদে ফাতেমা। এ ছয়টি মসজিদের সঙ্গে মসজিদে বনি হারাম বা মসজিদে কেবলাতাইনকে যোগ করে একসঙ্গে সাবয়ে মসজিদও বলা হয়। এর পাশেই রয়েছে মসজিদে রায়া। যেখানে বসে হুজুর (সা.) পরিখা খননের কাজ পরিচালনা করেন।
>> এছাড়াও মসজিদে নববির উত্তর দিকে বর্তমান বাসস্ট্যান্ডের পাশে রয়েছে মসজিদে সিজদাহ। এ মসজিদে নামাজ পড়ার সময় নবী (সা.) দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন বলে এ মসজিদের এই নামকরণ করা হয়েছে।
>> জান্নাতুল বাকির কাছেই রয়েছে মসজিদে ইজাবা। যেখানে হুজুর (সা.) এর তিনটি দোয়ার মধ্যে দুইটি কবুল করা হয় এবং একটি ফিরিয়ে দেয়া হয়।
>> মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে মসজিদে বনি হারাম, মসজিদে বনি গিফার, মসজিদে ফকির, মসজিদে বনি আনিফ, মসজিদে আইনাইন, মসজিদে তওবা, মসজিদে বানি জারিক, মসজিদে বেলাল ইত্যাদি।
পানির কূপ
১/বিরে আরিস বা খাতেম-
এই কূপের পাশেই হুজুর (সা.) হজরত আবু বকর, ওমর ও ওসমান (রা.) কে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। এটি মসজিদে কুবার পশ্চিম দিকে ছিল।
২/বিরে গুরস-
এই কূপটি মসজিদে কোবা থেকে পূর্বদিকে আধা মাইল দূরে অবস্থিত। এই কূপের পানি দিয়ে হুজুর (সা.) ওজু করেন, পান করেন।
৩/বিরে উসমান-
এটি মসজিদে কেবলাতাইনের সামনে ও ওয়াদিয়ে আকিকের উত্তরে অবস্থিত। ততকালীন ৪৩ হাজার দেরহাম দিয়ে ওসমান (রা.) তা ক্রয় করে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুল (সা.) বলেন, কল্যাণকর দান হচ্ছে ওসমানের দান।
৪/বিরে বুজাআ-
এই কূপটি মসজিদে নববির উত্তরে অবস্থিত। হুজুর (সা.) বলেন, এর পানি পবিত্র। কোনো কিছু এর পানিকে অপবিত্র করতে পারে না। এছাড়াও মদিনায় অবস্থিত হাদিসে বর্ণিত কিছু কূপের নাম উল্লেখ আছে। বিরেহা, বিরে আনাস ইবনে মালেক, বিরে সুকয়া, বিরে জারওয়ান, বিরে উরওয়া ইত্যাদি।
৫/ওয়াদিয়ে আকিক-
এটি মসজিদে নববির পশ্চিমে ও মদিনা ইউনিভার্সিটির সামনে অবস্থিত। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, এক রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত জিবরাঈল (আ.) আসেন। অতঃপর বলেন, এই জলাশয় হলো মুবারক জলাশয় অর্থাৎ ওয়াদিয়ে আকিক। হজরত ওমর (রা.) এই ওয়াদির মাটি দিয়ে মসজিদে নববির জমি ভরাট করেন। এছাড়াও রয়েছে ওয়াদিয়ে বাতহান, ওয়াদিয়ে মুজাইনি ইত্যাদি।
ঐতিহাসিক পাহাড়
১/ওহুদ পাহাড়-
মসজিদে নববি থেকে তিন মাইল উত্তরে এর অবস্থান। এই পাহাড়ের পাদদেশে ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসুল (সা.) বলেন, এটি ওহুদ পাহাড়। সে আমাদের ভালোবাসে আমরাও তাকে ভালোবাসি।
২/রুমাত পাহাড়-
এ পাহাড়ের অপর নাম আইনাইন। ওহুদ ময়দানের দক্ষিণ প্রান্তে এর অবস্থান। হুজুর (সা.) ওহুদ যুদ্ধের সময় এই পাহাড়ের ওপর আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) এর নেতৃত্বে ৫০ জন তীর নিক্ষেপকারীকে অটল এবং দৃঢ় থাকতে বলেছিলেন।
এটি মসজিদে নববির উত্তর-পশ্চিম কোণে সাবআ মসজিদের পূর্বে অবস্থিত। খন্দক যুদ্ধের সময় এ পাহাড়ের পাদদেশেই মুসলমানদের অবস্থান ছিল।
৩/সাওর এবং আইর পাহাড়-
হুজুর (সা.) এই দুইটি পাহাড়ের মাধ্যমে মদিনার উত্তর ও দক্ষিণের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যার একটি ওহুদ পাহাড়ের পেছনে ও আরেকটি জুল হুলাইফার কাছে অবস্থিত।
>> এছাড়াও মদিনার ঐতিহাসিক পাহাড়গুলোর মধ্যে আছে জাবালুর রায়া, জাবালে নার, উতুমুল মাজাত, জাবালে হারাম।
ঐতিহাসিক কবরস্থান
১/জান্নাতুল বাকি-
এটি মসজিদে নববির পাশেই পূর্বদিকে অবস্থিত। মদিনাবাসীর প্রধান কবরস্থান। এতে হজরত ফাতেমা, হজরত ওসমান, হাসান, উম্মুহাতুল মুমিনিনসহ প্রায় দশ হাজার সাহাবার কবর রয়েছে। এর একপাশে নতুন নতুন কবর হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখানে শুধু একটি পাথরের খণ্ড দিয়ে চিহ্নিত করা আছে একেকটি কবর।
২/ওহুদ যুদ্ধে শহীদদের কবরস্থান-
এটি মসজিদে নববি থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর দিকে অবস্থিত। এতে ওহুদ যুদ্ধে শহীদ ৭০ জন সাহাবাকে দাফন করা হয়। হুজুর (সা.) প্রায় সময়ই এখানে আসতেন এবং তাদের কবর জিয়ারত করতেন। এছাড়াও মদিনার বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি কবরস্থান রয়েছে।
বিদ্রঃ মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাঈন, ওহুদ পাহাড়, খন্দকের পাহাড় ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য মসজিদে নববীর বাইরে প্রবেশপথের কাছে ট্যাক্সিচালকেরা প্যাকেজের ব্যবস্থা করে থাকেন।
>> এছাড়াও সময় পেলে দেখতে পারেন মসজিদে নববীর উত্তর দিকের গেট দিয়ে বেরিয়েই সাহাবাদের মসজিদ, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাদশাহ ফাহাদ কোরআন শরিফ ছাপাখানা প্রকল্প।
আশাকরি আর্টিকেলটি আপনাদের ভাল লেগেছে। আজ এ পর্যন্তই।
সবাই ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন খোদাহাফেজ।
